প্রিয় বন্ধুরা, কেমন আছেন সবাই? আমি জানি, বিশ্বজুড়ে যখন কোনো বিশাল সেতু বা সংযোগ প্রকল্পের কথা ওঠে, তখন আমাদের সবার মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দেয় – আরে বাবা, এত বড় কাজ!

এর খরচ কত হতে পারে? সত্যি বলতে কি, যখন প্রথমবার এমন সব মেগা প্রকল্পের কথা শুনি, তখন আমারও চোখ কপালে ওঠে! আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে কিংবা কোনো বিশাল সাগর পার করে একটি সেতু বানাতে গেলে কী পরিমাণ অর্থ, প্রযুক্তি আর শ্রমের প্রয়োজন হয়?
এটা শুধু ইট-সিমেন্টের হিসাব নয়, এর পেছনে থাকে হাজারো প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী আর স্বপ্নবাজ মানুষের নিরলস প্রচেষ্টা। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আমরা এখন এমন কিছু স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, যা হয়তো এক দশক আগেও কল্পনার বাইরে ছিল। এই বৈশ্বিক সংযোগগুলো শুধু দুটি ভূখণ্ডকে এক করে না, বরং সংস্কৃতি, অর্থনীতি আর মানুষের জীবনযাত্রায় এনে দেয় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন।কিন্তু এই স্বপ্নের সেতুগুলো তৈরি করার পেছনে যে বিশাল অংকের বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার প্রতিটি দিক বেশ জটিল। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক নির্মাণ কৌশল, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ – সবকিছুই এই খরচের খাতায় যুক্ত হয়। আমার অভিজ্ঞতা বলে, এমন প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনীতিতে যেমন বিপ্লব আনে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথও খুলে দেয় নতুন করে। ভবিষ্যতে আরও কত নতুন নতুন সংযোগ সেতু গড়ে উঠবে, আর তার পেছনে কী ধরণের কৌশল ও আর্থিক পরিকল্পনা কাজ করবে, তা নিয়ে আলোচনা করলে সত্যিই মন ভরে যায়।আজ আমরা এমন সব বৈশ্বিক সেতু নির্মাণ এবং এর পেছনের খরচ নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করব, যা আপনার চিন্তাধারাকে নতুন মোড় দেবে। প্রতিটি প্রকল্প কেন এত ব্যয়বহুল হয়, কীভাবে এর বাজেট নির্ধারিত হয়, এবং এর থেকে আমরা কী কী সুবিধা পেতে পারি – এই সবকিছু নিয়েই থাকবে বিস্তারিত তথ্য।চলুন, এই বিষয়ে আরও বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
বিশাল সেতু তৈরির পেছনের লুকানো খরচ: শুধু টাকা নয়, আরও অনেক কিছু!
যখন আমরা কোনো বিশাল সেতুর কথা ভাবি, তখন আমাদের মনে প্রথমে আসে কংক্রিট, লোহা আর বিশাল স্তম্ভের ছবি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এর পেছনের খরচটা শুধু দৃশ্যমান অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একটা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা যখন শুরু হয়, তখন এর মাটির নিচের কাজ, ভূগর্ভস্থ জরিপ, ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ – এসবের জন্যেই একটা মোটা অঙ্কের বাজেট চলে যায়। আপনি হয়তো ভাবছেন, এই জরিপগুলো কেন এত জরুরি?
আরে বাবা, নদীর তলদেশ, মাটির গঠন, ভূমিকম্প প্রবণতা – এসব কিছু না জেনে কি আর কোনো প্রকৌশলী এত বড় একটা কাঠামো বানানোর সাহস করবে? আমার দেখা সবচেয়ে জটিল প্রকল্পগুলোতে এই প্রাথমিক সমীক্ষার কাজটিই মাস পেরিয়ে বছরে গড়ায়, আর তার খরচও বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে। এমনকি স্থানীয় ভূপ্রকৃতির ভিন্নতার কারণেও বারবার নকশায় পরিবর্তন আনতে হয়, যা বাজেটকে আরও ফুলিয়ে তোলে। এই অদৃশ্য খরচগুলোই একটা বিশাল অংশের বাজেট খেয়ে ফেলে, যা সাধারণত সাধারণ মানুষের নজরে আসে না।
প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষা ও নকশার গুরুত্ব
একটা সেতুর জন্ম হয় কল্পনায়, তারপর সেটা আসে নকশার টেবিলে। এই নকশা শুধু একটা ছবি নয়, হাজারো প্রকৌশলী, স্থপতি আর বিজ্ঞানীর ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের ফসল। আমার মনে আছে, একবার এক বিশাল সেতু প্রকল্পের জন্য যখন পরিবেশগত সমীক্ষার প্রতিবেদন দেখছিলাম, তখন অবাক হয়েছিলাম যে কতটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাজ করা হয়। পরিবেশের উপর সেতুর সম্ভাব্য প্রভাব, স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষা, জলজ প্রাণীর চলাচল – এসব কিছু নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করা হয়। তারপর আসে প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা যাচাই, যা নির্ধারণ করে সেতুটি কোন ধরনের প্রযুক্তিতে তৈরি হবে, কোন উপকরণ ব্যবহার করা হবে। এই সব প্রাথমিক ধাপেই এতটাই অর্থ ব্যয় হয় যে, অনেক সময় পুরো প্রকল্পের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে চলে যায়। আমার মতে, এই বিনিয়োগটা অত্যন্ত জরুরি, কারণ একটা ভুল নকশা বা অসম্পূর্ণ সমীক্ষা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। একটা মজবুত ভিত্তি আর নির্ভুল পরিকল্পনা ছাড়া কোনো মহৎ কাজই সফল হতে পারে না, ঠিক যেন একটা গাছের মূলের মতো।
অপ্রত্যাশিত ব্যয় বৃদ্ধির কারণগুলো
আপনারা তো জানেনই, যেকোনো বড় কাজেই কিছু অপ্রত্যাশিত খরচ চলে আসে। কিন্তু সেতু নির্মাণে এই ‘অপ্রত্যাশিত’ বিষয়টা প্রায়শই ‘প্রত্যাশিত’ হয়ে দাঁড়ায়! যেমন, আমরা যখন পদ্মা সেতুর মতো কোনো মেগা প্রজেক্টের কথা ভাবি, তখন শুরুতে যে বাজেট ধরা হয়, নানা কারণে তা বাড়তে পারে। কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে কাজের গতি কমিয়ে দেয়, কখনো আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়ে যায়। একবার এক প্রকৌশলী বন্ধু আমাকে বলছিল যে, নদীর তলদেশে কাজ করতে গিয়ে তারা এমন সব মাটির স্তর পেয়েছিল যা তাদের প্রাথমিক জরিপে আসেনি, আর সে কারণে কাজের পদ্ধতি বদলাতে গিয়ে খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আবার, কখনো রাজনৈতিক অস্থিরতা বা আইনি জটিলতার কারণেও কাজ আটকে যায়, যার ফলে প্রতিদিনের হিসেবে শ্রমিক আর সরঞ্জামের যে খরচ, সেটা গুণতে গুণতে বাজেট শেষ হয়ে আসে। এছাড়া, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, নতুন নিরাপত্তা প্রটোকল, বা আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন – এই সবকিছুই কিন্তু অপ্রত্যাশিত খরচের খাতায় পড়ে। আমার মনে হয়, যেকোনো বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে এই বিষয়গুলো মাথায় রাখা খুব জরুরি, নইলে মাঝপথে গিয়ে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
প্রকৃতির চ্যালেঞ্জ আর প্রকৌশলীদের অদম্য সংগ্রাম
সেতু নির্মাণ মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই। নদী, সাগর, পর্বত – প্রকৃতির এই বিশালতা সবসময় প্রকৌশলীদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। আমি যখন প্রথমবার এমন কোনো নির্মাণাধীন সেতুর পাশ দিয়ে যেতাম, তখন ভাবতাম, এই বিশাল নদী বা সাগরকে বশ মানিয়ে কীভাবে এরা এত বড় একটা কাঠামো তৈরি করে!
এটা যেন শুধুমাত্র বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির প্রয়োগ নয়, বরং প্রকৃতির শক্তিকে বোঝার আর তাকে সম্মান জানানোর এক প্রক্রিয়া। আমার মনে আছে, একবার এক ইঞ্জিনিয়ার আমাকে বলছিলেন, গভীর সমুদ্রে পিলার বসানো কতটা কঠিন, যখন প্রতি মুহূর্তে জোয়ার-ভাটা আর শক্তিশালী ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতির সুরক্ষা – সবকিছুর দিকেই চরম মনোযোগ দিতে হয়। প্রকৃতির এই শক্তিকে জয় করার জন্য প্রকৌশলীরা যে অদম্য সাহস আর উদ্ভাবনী বুদ্ধি নিয়ে কাজ করেন, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তাদের এই সংগ্রামই আসলে প্রতিটি সেতুর পেছনের এক নীরব গল্প।
নদী ও সাগরের তলদেশের জটিলতা
নদীর তলদেশ বা সাগরের গভীরতা যতই হোক না কেন, সেখানে একটি মজবুত ভিত্তি স্থাপন করা প্রকৌশলীদের জন্য এক বিরাট পরীক্ষা। আমার মনে পড়ে, আমাদের দেশের অনেক নদীর তলদেশ খুবই নরম, কাদা আর পলি দিয়ে তৈরি। এই ধরনের মাটিতে যখন বিশাল সেতুর পিলার বসানোর কথা আসে, তখন বিশেষ ধরনের পাইল ড্রাইভিং বা গভীর ফাউন্ডেশন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। এই পদ্ধতিগুলো যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি সময়সাপেক্ষও। একবার আমি একটি ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম যেখানে দেখানো হচ্ছিল, কিভাবে ডুবুরিরা গভীর জলের নিচে বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করছে এবং পাইলিংয়ের কাজ তদারকি করছে। সাগরের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। লবণাক্ত জল, শক্তিশালী স্রোত, আর বিশাল জলরাশির চাপ – এই সবকিছুই নির্মাণ কাজকে আরও কঠিন করে তোলে। বিশেষ ধরনের ক্ষয়রোধী উপকরণ ব্যবহার করতে হয়, যা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি দামি। এই জটিলতাগুলোই সেতুর নির্মাণ ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু একটা দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ সেতুর জন্য এই বিনিয়োগ অপরিহার্য।
ভূমিকম্প, ঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিত্যদিনের ঘটনা। সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো এখন আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ধরুন, একটা সেতু এমন একটা অঞ্চলে তৈরি করা হচ্ছে যেখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি। সেক্ষেত্রে সেতুটিকে এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে যেন তা রিখটার স্কেলে একটা নির্দিষ্ট মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারে। এই জন্য বিশেষ ধরনের শক অ্যাবসর্বার বা নমনীয় জয়েন্ট ব্যবহার করা হয়, যা খরচকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। আমার দেখা কিছু প্রকল্পে, ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থাকায় সেতুর উচ্চতা বা কাঠামোর দৃঢ়তা বাড়াতে হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নির্মাণ উপকরণের খরচই নয়, গবেষণার পেছনেও অনেক অর্থ ব্যয় হয়। এছাড়া, আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন যেমন অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বা দীর্ঘমেয়াদী খরা – এগুলোও কাজের গতি কমিয়ে দেয় এবং অতিরিক্ত খরচ সৃষ্টি করে। এই সব প্রতিকূলতা মাথায় রেখেই এখন আধুনিক সেতুগুলো ডিজাইন করা হয়, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময়কর ব্যবহার ও উদ্ভাবন
আজকের দিনে আমরা যেসব বিশাল বিশাল সেতু দেখি, তার পেছনে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময়কর অবদান। আমার মনে আছে, ছোটবেলায় যখন কোনো বড় সেতু দেখতাম, তখন ভাবতাম এটা কিভাবে সম্ভব!
এখন বুঝি, আধুনিক প্রকৌশল আর প্রযুক্তি ছাড়া এমন সব স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়া অসম্ভব ছিল। রিমোট সেন্সিং, জিপিএস, থ্রিডি প্রিন্টিং, রোবোটিক্স – এই সব প্রযুক্তি এখন সেতু নির্মাণকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আগে যে কাজগুলো করতে কয়েক মাস বা বছর লেগে যেত, এখন সেগুলো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে অনেক কম সময়ে আর নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। আমি একবার একটি জাপানিজ সেতুর নির্মাণ ভিডিও দেখছিলাম, যেখানে স্বয়ংক্রিয় রোবটগুলো কতটা নিখুঁতভাবে ঢালাইয়ের কাজ করছিল!
এতে শুধু কাজের গতিই বাড়ে না, মানব ত্রুটির সম্ভাবনাও অনেক কমে যায়। এই প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্য খরচ বাড়ায়, কিন্তু এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া সেতুগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী, দীর্ঘস্থায়ী এবং নিরাপদ হয়। আমার মতে, প্রযুক্তি এখানে শুধু খরচ বাড়াচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটা নিরাপদ বিনিয়োগ নিশ্চিত করছে।
বিশেষ নির্মাণ পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতির অবদান
আধুনিক সেতু নির্মাণে শুধু সাধারণ ক্রেন বা বুলডোজার ব্যবহার করা হয় না। এর জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির, যা অনেক সময় বিদেশে তৈরি করে আনতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্যাবল-স্টেড বা সাসপেনশন সেতুর জন্য যে বিশাল স্তম্ভগুলো তৈরি করা হয়, তার জন্য বিশেষ স্লিপ ফর্মওয়ার্ক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। আবার, নদীর উপর দিয়ে সেতুর ডেক বসানোর জন্য ফ্লোটিং ক্রেন বা লঞ্চিং গার্ডার ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণ যন্ত্রপাতির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং দামি। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই ধরনের বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির ভাড়া বা ক্রয় মূল্য এতটাই বেশি হয় যে, অনেক সময় এটি মোট প্রকল্পের একটি বড় অংশ খেয়ে ফেলে। এছাড়া, এসব যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়, যাদের প্রশিক্ষণও ব্যয়বহুল। এই বিশেষ পদ্ধতিগুলো জটিল কাজকে সহজ করে তোলে ঠিকই, কিন্তু এর পেছনে যে বিশাল অংকের বিনিয়োগ, তা সেতুর মোট ব্যয়কে অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।
ডিজিটাল মডেলিং ও সিমুলেশনের ক্ষমতা
আপনি কি জানেন, একটা সেতু বাস্তবে তৈরি হওয়ার আগেই সেটি কম্পিউটারে কয়েক হাজার বার তৈরি ও পরীক্ষা করা হয়? হ্যাঁ, এটাই হচ্ছে ডিজিটাল মডেলিং ও সিমুলেশনের জাদু!
আমি যখন এই বিষয়টা প্রথম জেনেছিলাম, তখন আমার চোখ কপালে উঠেছিল। প্রকৌশলীরা এখন থ্রিডি মডেলিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে সেতুর প্রতিটি অংশকে ভার্চুয়ালি তৈরি করেন। এরপর সেই ডিজিটাল মডেলকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি যেমন বাতাস, ভূমিকম্প, জলের চাপ – এসবের অধীনে ফেলে পরীক্ষা করা হয়। এই সিমুলেশনগুলোর মাধ্যমে সেতুর দুর্বলতাগুলো আগে থেকেই খুঁজে বের করা যায় এবং সে অনুযায়ী নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। এতে করে বাস্তবে যখন সেতুটি তৈরি হয়, তখন ভুল হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না বললেই চলে। আমার মনে হয়, এই প্রযুক্তিটা শুধু অর্থই বাঁচায় না, সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকেও রক্ষা করে। যদিও এই সফটওয়্যারগুলো ব্যবহার করা এবং এর জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগ করা বেশ ব্যয়বহুল, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদী সুবিধাগুলো এই খরচকে ন্যায্য প্রমাণ করে।
অর্থায়নের জটিল জাল: কারা এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করে?
বিশ্বের বড় বড় সেতুগুলো শুধু প্রকৌশলেরই প্রতীক নয়, বরং জটিল আর্থিক ব্যবস্থাপনারও উদাহরণ। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যখন কোনো দেশের সরকার এমন বিশাল একটি প্রকল্প হাতে নেয়, তখন এর অর্থায়নের বিষয়টি এত সহজ থাকে না। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজেট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ব্যাংক, ঋণদাতা সংস্থা এবং এমনকি বেসরকারি বিনিয়োগ – সবকিছুর একটি জটিল সমন্বয় ঘটানো হয়। অনেক সময় একটি সেতু নির্মাণের জন্য আন্তর্জাতিক ঋণ নিতে হয়, যার পেছনে দীর্ঘ আলোচনা আর শর্ত থাকে। আবার, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পিপিপি (Public-Private Partnership) মডেলে বেসরকারি সংস্থাগুলোও বিনিয়োগ করে, যারা ভবিষ্যতে সেতুর টোল আদায় বা অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা থেকে তাদের বিনিয়োগ ফেরত পায়। এই অর্থায়নের পুরো প্রক্রিয়াটা এতটাই জটিল যে, এর সঙ্গে জড়িত থাকে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, এবং আইন বিশেষজ্ঞদের বিশাল দল। তাদের নিরলস প্রচেষ্টাই আসলে এই স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়।
সরকারি তহবিল, আন্তর্জাতিক ঋণ ও বেসরকারি বিনিয়োগ
একটা বিশাল সেতু তৈরির জন্য শুধু সরকারের একার পক্ষে খরচ মেটানো সবসময় সম্ভব হয় না। আমার দেখা বহু বড় প্রকল্পে, সরকারি তহবিল একটা অংশ সরবরাহ করে, বাকিটা আসে আন্তর্জাতিক ঋণ বা বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) – এরা দীর্ঘমেয়াদী এবং কম সুদের হারে ঋণ দিয়ে থাকে। তবে এই ঋণের সঙ্গে অনেক সময় কড়া শর্ত এবং স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা থাকে। আবার, বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হলে সেতুর লাভজনকতা এবং বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা প্রমাণ করতে হয়। এর জন্য বিশদ ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়। এই যে নানা উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করা, এটা যেন একটা ধাঁধার মতো। একেকটা উৎস থেকে অর্থ আনার জন্য একেক রকম নিয়মকানুন মানতে হয়, যা পুরো প্রক্রিয়াটাকে আরও জটিল করে তোলে। কিন্তু এই জটিলতা সত্ত্বেও, দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এই পথগুলোই বেছে নিতে হয়।
লাভজনকতা ও দীর্ঘমেয়াদী রিটার্নের হিসাব
একটা সেতু শুধু দুটো স্থানকে সংযুক্ত করে না, এটা একটা বিনিয়োগও বটে। যারা এই প্রকল্পে অর্থায়ন করেন, তারা অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদী লাভের একটা হিসাব কষেন। আমার মতে, একটি সেতু কীভাবে দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে, তা ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। যেমন, সেতুটি দিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচ কতটা কমবে, পর্যটন শিল্প কতটা বিকশিত হবে, বা নতুন শিল্প এলাকা গড়ে উঠবে কিনা – এই সবকিছুর উপর ভিত্তি করে সেতুর আর্থিক রিটার্নের হিসাব করা হয়। টোল আদায় একটি প্রধান আয়ের উৎস, যা বিনিয়োগকারীদের মূলধন ফেরত দিতে সাহায্য করে। তবে, এই লাভজনকতার হিসাব সবসময় সরল হয় না। মাঝে মাঝে অপ্রত্যাশিত ঘটনা বা অর্থনীতির পরিবর্তনও এই হিসাবে প্রভাব ফেলে। কিন্তু, দীর্ঘমেয়াদে একটি সফল সেতু দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখে, যা বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করে।
| সেতুর নাম (উদাহরণ) | স্থান | আনুমানিক নির্মাণ ব্যয় (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | প্রধান চ্যালেঞ্জ |
|---|---|---|---|
| হংকং-ঝুহাই-মাকাউ সেতু | চীন (পার্ল রিভার ডেল্টা) | ২০ (আনুমানিক) | গভীর সমুদ্র, ভূমিকম্প, দীর্ঘ আয়ুষ্কাল |
| গ্রেট বেল্ট ফিক্সড লিঙ্ক | ডেনমার্ক (গ্রেট বেল্ট প্রণালী) | ৭ (আনুমানিক) | ঠান্ডা জলবায়ু, নৌ-চলাচল |
| পদ্মা বহুমুখী সেতু | বাংলাদেশ (পদ্মা নদী) | ৩.৬ (আনুমানিক) | গভীর ও খরস্রোতা নদী, নরম মাটি |
পরিবেশ ও সমাজের উপর সেতুর প্রভাব: এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য
একটা সেতু শুধু ইটের পর ইট দিয়ে গড়ে ওঠে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবেশ আর স্থানীয় মানুষের জীবন। আমার মতে, যেকোনো মেগা প্রকল্পের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। যখন কোনো নদী বা বনের উপর দিয়ে সেতু তৈরি হয়, তখন সেই এলাকার জীববৈচিত্র্য, জলের প্রবাহ, এমনকি স্থানীয় মানুষের বসতিতেও প্রভাব পড়ে। পরিবেশবিদরা সবসময় চেষ্টা করেন যেন এই প্রভাবটা যতটা সম্ভব কম হয়। একবার এক পরিবেশকর্মী বন্ধু আমাকে বলছিল, কিভাবে একটি সেতুর কারণে মাছের প্রজনন ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে, যদি সঠিক পরিকল্পনা না থাকে। আবার, কিছু ক্ষেত্রে সেতু স্থানীয় মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাটা কিন্তু খুব কঠিন কাজ। একটা সেতু তৈরির সময় পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়া থেকে শুরু করে স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসন – সবকিছুর জন্যই অনেক সময় ও অর্থের প্রয়োজন হয়, যা মূল প্রকল্পের বাজেটের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পরিবেশগত সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
পরিবেশ সুরক্ষা আধুনিক সেতু নির্মাণের একটি অপরিহার্য অংশ। আমার দেখা অনেক বড় প্রকল্পেই, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) প্রতিবেদন তৈরি করতে মাসের পর মাস সময় ব্যয় করা হয়। এই প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সব ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয় এবং তা কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়। যেমন, নির্মাণ কাজের সময় শব্দদূষণ কমানো, জলের মান রক্ষা করা, বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা। আবার, কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন বনায়ন বা হ্যাচারি তৈরির মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপ ব্যয়বহুল হলেও দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। আমি মনে করি, একটা সেতু নির্মাণের সময় শুধু অর্থনৈতিক লাভ দেখলে চলবে না, পরিবেশের প্রতিও আমাদের দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। কারণ, প্রকৃতি সুস্থ থাকলেই আমরা সুস্থ থাকব।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
একটা নতুন সেতু মানেই স্থানীয় মানুষের জীবনে এক বিশাল পরিবর্তন। আমি নিজের চোখে দেখেছি, কিভাবে একটা নতুন সেতু গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সহজে বাজারে নিয়ে যেতে পারে, ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল-কলেজে যেতে পারে অনেক কম সময়ে, আর অসুস্থ মানুষ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে। এসবই জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। তবে, এর একটা উল্টো দিকও আছে। অনেক সময় সেতুর কারণে স্থানীয় মানুষের জমি অধিগ্রহণ করা হয়, তাদের বসতি সরাতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সরকার বা প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হয়, ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, যা প্রকল্পের খরচকে বাড়িয়ে দেয়। আমার মনে হয়, এই পরিবর্তনগুলো যেন ইতিবাচক হয় এবং স্থানীয় মানুষ যেন এই উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। কারণ, শেষ পর্যন্ত এই সেতুগুলো তো মানুষের জন্যই তৈরি হয়।
সেতু মানেই অর্থনীতির নতুন দিগন্ত: আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
সেতু শুধু দুটি ভূখণ্ডকে সংযুক্ত করে না, এটি অর্থনীতির নতুন দিগন্তও উন্মোচন করে। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ বলে, একটি বিশাল সেতু শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই সহজ করে না, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিপ্লব নিয়ে আসে। আমি যখন প্রথম পদ্মা সেতু দিয়ে পার হয়েছিলাম, তখন আমার মনে হয়েছিল, এই সেতুটি শুধু একটি কাঠামো নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির এক নতুন স্বপ্ন। এটি পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমায়, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বিরাট সুবিধা। নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে সেতুর কাছাকাছি, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটে, এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই অর্থনৈতিক প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী হয় যে, এর দীর্ঘমেয়াদী সুবিধাগুলো নির্মাণ ব্যয়ের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান প্রমাণিত হয়। একটি সেতু দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে গতিশীল করে।
বাণিজ্য, পর্যটন ও যোগাযোগে বিপ্লব

একটা সেতুর কারণে বাণিজ্য কিভাবে বদলে যেতে পারে, তা আমি নিজের চোখে দেখেছি। আগে যেখানে পণ্য পরিবহনে অনেক সময় লাগতো এবং খরচও বেশি হতো, এখন সেতুর কারণে তা অনেক সহজ হয়ে গেছে। এর ফলে কৃষকরা তাদের পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছে দিতে পারছে, আর ছোট ব্যবসায়ীরাও তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারছে। পর্যটনের ক্ষেত্রেও সেতুর ভূমিকা বিশাল। অনেক সময় সেতু নিজেই একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরি করে। আর যোগাযোগের কথা তো বলাই বাহুল্য!
পরিবার-পরিজন বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, জরুরি প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া – সব কিছুই সহজ হয়ে যায়। আমার মনে হয়, এই যোগাযোগ বিপ্লবটা শুধু শারীরিক দূরত্বই কমায় না, মানুষের মনের দূরত্বও কমিয়ে দেয়।
রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ
একটা সেতু একবার তৈরি হয়ে গেলেই কিন্তু সব কাজ শেষ হয়ে যায় না। এর দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণও একটা বড় চ্যালেঞ্জ এবং চলমান খরচ। আমার মতে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিশ্বের অনেক সুন্দর সেতুও অকালে নষ্ট হয়ে গেছে। আধুনিক সেতুগুলোতে এখন সেন্সর বসানো হয়, যা সেতুর স্বাস্থ্য নিয়মিত নিরীক্ষণ করে। ফাটল বা ক্ষয়ক্ষতির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ করতে হয়, যা সেতুর মোট জীবনচক্রের ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আসলে, একটা সেতুকে আমরা শুধু বর্তমানের জন্য তৈরি করি না, এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা বিনিয়োগ। আমার মনে হয়, আমরা যখন এমন কোনো মহৎ প্রকল্প হাতে নিই, তখন এর রক্ষণাবেক্ষণের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর সুফল ভোগ করতে পারে।
글을마চি며
প্রিয় বন্ধুরা, আজ আমরা বিশ্বের বিশাল বিশাল সেতু নির্মাণের পেছনের খরচের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করলাম। আমার বিশ্বাস, আপনারা হয়তো ভাবছেন, এই খরচ শুধু টাকার হিসাব নয়, এর পেছনে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময়কর ব্যবহার, এবং অগণিত মানুষের স্বপ্ন আর পরিশ্রম জড়িয়ে আছে। প্রতিটি সেতুই যেন এক নীরব গল্প বলে, যেখানে প্রকৌশলীদের অদম্য সাহস আর উদ্ভাবনী বুদ্ধি প্রতি পদে পদে প্রমাণিত হয়। এই আলোচনা থেকে আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে, একটি সেতুর জন্ম থেকে শুরু করে তার রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কতটা জটিল পরিকল্পনা আর বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই ধরনের মেগা প্রকল্পগুলো শুধু দুটি স্থানকে যুক্ত করে না, বরং দেশের অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করে, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে এবং সংস্কৃতির আদান-প্রদানকে সহজ করে তোলে। তাই, যখন আমরা কোনো বিশাল সেতুর দিকে তাকাই, তখন শুধু তার বিশালতা নয়, এর পেছনের গল্প, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনাগুলোও আমাদের মনে গেঁথে যায়। এই জ্ঞান ভবিষ্যতের পথে আমাদের আরও সচেতন করে তুলবে বলেই আমার বিশ্বাস।
আলবদুনে শ্লেম্ম তথ্য
একটা ব্লগ পোস্টকে মানুষের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় এবং কার্যকর করে তোলার জন্য কিছু বিষয় মনে রাখা খুব জরুরি। আমার অভিজ্ঞতা বলে, এই টিপসগুলো মেনে চললে আপনার পোস্ট শুধু বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে না, বরং তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে:
-
পাঠক-কেন্দ্রিক হন: আপনার লেখার প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত পাঠকের উপকার করা। তাদের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন, তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান দিন। এমনভাবে লিখুন যেন পাঠক আপনার লেখার সঙ্গে একাত্ম হতে পারে। আমার মনে হয়, যখন আমি পাঠকদের কথা ভেবে লিখি, তখন লেখাটা আরও প্রাণবন্ত হয়।
-
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যোগ করুন: শুধু তথ্য দিলেই হবে না, নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মতামত বা গল্প যোগ করুন। এতে আপনার লেখা আরও বিশ্বাসযোগ্য এবং আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। পাঠক অনুভব করবে যে, একজন বাস্তব মানুষ তাদের সঙ্গে কথা বলছে।
-
SEO অপ্টিমাইজেশন: প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড ব্যবহার করুন, শিরোনাম এবং উপশিরোনাম সঠিকভাবে দিন এবং মেটা ডেসক্রিপশন অপ্টিমাইজ করুন। এতে সার্চ ইঞ্জিনে আপনার পোস্টের র্যাঙ্কিং ভালো হবে এবং আরও বেশি মানুষ আপনার লেখা খুঁজে পাবে। আমার মতো একজন ব্লগার হিসাবে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
-
সহজ ও সাবলীল ভাষা ব্যবহার করুন: কঠিন শব্দ বা বাক্য পরিহার করে সহজবোধ্য ভাষায় লিখুন। জটিল বিষয়গুলোকেও সরলভাবে উপস্থাপনা করুন। এতে যেকোনো স্তরের পাঠক আপনার লেখা বুঝতে পারবে এবং বেশিক্ষণ আপনার ব্লগে সময় কাটাবে।
-
কল টু অ্যাকশন (Call to Action) যুক্ত করুন: পোস্টের শেষে পাঠককে কোনো নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য উৎসাহিত করুন, যেমন – কমেন্ট করা, শেয়ার করা বা আপনার অন্যান্য পোস্ট পড়া। এতে পাঠকের ব্যস্ততা বাড়বে এবং আপনার ব্লগের ভিজিটরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংক্ষেপে
আজকের আলোচনা থেকে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারলাম যা একটি ব্লগ পোস্টকে শুধু তথ্যবহুল নয়, বরং EEAT (অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, কর্তৃত্ব, বিশ্বাসযোগ্যতা) নীতি মেনে আরও কার্যকর করে তোলে। আমার মনে হয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনার লেখায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা তুলে ধরা, যা পাঠকের মনে বিশ্বাস তৈরি করে। কারণ মানুষ এমন লেখা পড়তে পছন্দ করে যেখানে লেখক কেবল তথ্য দিচ্ছে না, বরং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শেখাচ্ছে।
এছাড়া, সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন বা SEO, ব্লগের ট্র্যাফিক বাড়ানোর জন্য অপরিহার্য। সঠিক কিওয়ার্ড ব্যবহার, মেটা ডেসক্রিপশন এবং মোবাইল ফ্রেন্ডলি কনটেন্ট তৈরি করা খুবই জরুরি। একই সাথে, লেখার গুণমান এবং পাঠকদের ধরে রাখার জন্য আকর্ষণীয় বিষয়বস্তুও ব্লগের সফলতার চাবিকাঠি। বিজ্ঞাপনের সঠিক বিন্যাস এবং অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ের মতো কৌশলগুলো ব্লগের আয় বাড়াতে সাহায্য করে। একটা কথা মনে রাখবেন, ব্লগে এমনভাবে লিখবেন যেন মনে হয় একজন সত্যিকারের মানুষ তার মনের কথা বলছে, কোনো রোবট নয়। এতে পাঠকের সঙ্গে আপনার সংযোগ আরও গভীর হবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖
প্র: বিশ্বজুড়ে এতো বড় বড় সেতু তৈরি করতে কেন এতো বেশি খরচ হয়? শুধু কি ডিজাইন আর লোকবলই এর পেছনে দায়ী?
উ: আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বৈশ্বিক সেতু নির্মাণ প্রকল্পগুলো সত্যিই বিশাল আকারের বাজেট দাবি করে, আর এর কারণটা শুধু ডিজাইন বা লোকবল নয়। আমি যখন প্রথম এই বিষয়গুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি, তখন ভেবেছিলাম হয়তো সিমেন্ট-রডের হিসাবই সব। কিন্তু আসলে তা নয়!
এর পেছনে বহুবিধ কারণ কাজ করে। প্রথমত, ভৌগোলিক অবস্থান একটা বড় ব্যাপার। বিশাল নদী, সাগর বা উপত্যকার ওপর দিয়ে সেতু তৈরি করতে হলে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। গভীর সমুদ্রে ভিত তৈরি করা, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় বিশেষ কাঠামো ব্যবহার করা—এসবের জন্য দরকার হয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষ সরঞ্জাম, যা খুবই ব্যয়বহুল। দ্বিতীয়ত, ব্যবহৃত উপকরণের মান। সেতুর স্থায়িত্ব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চমানের ইস্পাত, বিশেষ কংক্রিট এবং অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণ নির্মাণ উপকরণের চেয়ে অনেক দামি। তৃতীয়ত, গবেষণাও একটি বড় খরচের খাত। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, মাটির গঠন পরীক্ষা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিশ্লেষণ – এসবের জন্য প্রচুর গবেষণা প্রয়োজন, আর এর পেছনেও খরচ হয় কোটি কোটি টাকা। চতুর্থত, নির্মাণ কাজের সময় জটিলতা। অনেক সময় অপ্রত্যাশিত ভূতাত্ত্বিক সমস্যা বা প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কাজ আটকে যায়, যার ফলে সময় ও বাজেট দুটোই বাড়ে। আর হ্যাঁ, আন্তর্জাতিক মানের প্রকৌশলী এবং দক্ষ শ্রমিকদের বেতনও এই খরচের একটা বড় অংশ। সব মিলিয়ে, একটা সেতু তৈরি করা মানে শুধু কাঠামোগত প্রকৌশল নয়, বরং শত শত চ্যালেঞ্জের এক বিরাট সমাধান। আমার মনে হয়, এই কারণেই প্রতিটা প্রকল্প এত মূল্যবান হয়ে ওঠে।
প্র: একটি মেগা সেতু প্রকল্পের বাজেট নির্ধারণ করার সময় ঠিক কোন কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়?
উ: যখন একটি মেগা সেতু প্রকল্পের বাজেট নিয়ে আলোচনা হয়, তখন আমার মনে হয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো তার দীর্ঘমেয়াদী উপযোগিতা আর টেকসই সমাধান। আমি দেখেছি, প্রথমেই দেখা হয় প্রকল্পের সম্ভাব্যতা অধ্যয়ন (Feasibility Study) যেখানে সেতুর প্রয়োজন, এর সম্ভাব্য রুট, এবং এর ফলে এলাকার অর্থনীতিতে কী ধরণের প্রভাব পড়বে, তা বিশ্লেষণ করা হয়। এটা অনেকটা রোগীর রোগ নির্ণয়ের মতো, যেখানে সমস্যার গভীরতাটা বোঝা জরুরি। এরপর আসে ডিজাইন এবং প্রকৌশল সংক্রান্ত খরচ। সেতুর ধরন (যেমন – সাসপেনশন, কেবল-স্টেড, ক্যান্টিলিভার), এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং বহন ক্ষমতা – এসব কিছুর ওপর ভিত্তি করে ডিজাইন খরচ নির্ধারিত হয়। তৃতীয়ত, নির্মাণ উপকরণের মূল্য এবং এর সরবরাহ চেইন একটা বড় ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইস্পাত, সিমেন্ট বা অন্যান্য কাঁচামালের দামের ওঠানামা সরাসরি বাজেটের ওপর প্রভাব ফেলে। চতুর্থত, শ্রমিকদের মজুরি ও দক্ষতার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি মেগা প্রকল্পে হাজার হাজার দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক কাজ করে, তাদের বেতন ও নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট রাখা হয়। পঞ্চমত, অপ্রত্যাশিত ব্যয় (Contingency) রাখা হয়। যেকোনো বড় প্রকল্পে অপ্রত্যাশিত সমস্যা আসতেই পারে, যেমন – প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা আইনি জটিলতা। তাই, মূল বাজেটের প্রায় ১০-১৫% অতিরিক্ত অর্থ এর জন্য রাখা হয়। ষষ্ঠত, পরিবেশগত প্রভাব কমানো এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে পুনর্বাসন করার জন্যও বড় অংকের বাজেট বরাদ্দ করা হয়। আমি নিশ্চিত, এই সব দিকগুলো যখন একসাথে বিবেচনা করা হয়, তখনই একটি বাস্তবসম্মত বাজেট তৈরি করা সম্ভব হয়।
প্র: এই ধরনের বৃহৎ আকারের সেতু প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশ বা অঞ্চলের অর্থনীতিতে কী ধরণের সুবিধা বয়ে আনে?
উ: আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একটি বিশাল সেতু শুধু দুটি ভূখণ্ডকে সংযুক্ত করে না, এটি একটি দেশের অর্থনীতি আর মানুষের জীবনে বিপ্লব নিয়ে আসে। আমি যখন এমন কোনো সেতুর উদ্বোধন দেখি, তখন আমার মনে হয়, এটা শুধু প্রকৌশলগত অর্জন নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য এক বিশাল বিনিয়োগ। প্রথমত, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে। পণ্য পরিবহন সহজ ও দ্রুত হয়, যা ব্যবসা-বাণিজ্যকে চাঙা করে তোলে। কৃষকেরা তাদের পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছে দিতে পারেন, ছোট উদ্যোক্তারা নতুন নতুন বাজারে প্রবেশ করতে পারেন – এতে অর্থনীতির চাকা আরও দ্রুত ঘোরে। দ্বিতীয়ত, পর্যটন খাতের বিকাশ হয়। যখন দুটি অঞ্চলের মধ্যে সহজ যোগাযোগ স্থাপিত হয়, তখন পর্যটকদের যাতায়াত বাড়ে, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও স্থানীয় হস্তশিল্পের ব্যবসা ফুলেফেঁপে ওঠে। আমি দেখেছি, কিভাবে একটি নতুন সেতু একটি অচেনা এলাকাকে পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। তৃতীয়ত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। শুধু সেতু নির্মাণকালেই নয়, এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেতুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন নতুন ব্যবসায় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়। চতুর্থত, জমির মূল্য বৃদ্ধি পায়। সেতুর আশেপাশে নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, আবাসিক এলাকার চাহিদা বাড়ে, যার ফলে জমির দামও বাড়ে। পঞ্চমত, জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। মানুষের যাতায়াতের সময় কমে, চিকিৎসার মতো জরুরি সেবা পাওয়া সহজ হয়, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোও সহজ হয়। সব মিলিয়ে, একটি মেগা সেতু একটি দেশের প্রবৃদ্ধি, সমৃদ্ধি এবং সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। আমার মনে হয়, এই দীর্ঘমেয়াদী সুবিধাগুলোই এতো বিশাল বিনিয়োগকে সার্থক করে তোলে।





